এনবিআরের প্রাক-বাজেট আলোচনা

প্রত্যন্ত ও অনগ্রসর এলাকার বিনিয়োগকারীদের জন্য আলাদা কর অবকাশ সুবিধা চায় বেপজা

প্রত্যন্ত, অনগ্রসর ও অনুন্নত এলাকার বিনিয়োগকারীদের জন্য আলাদা কর অবকাশ সুবিধা চায় বাংলাদেশ রফতানি প্রক্রিয়াকরণ এলাকা কর্তৃপক্ষ (বেপজা)।

প্রত্যন্ত, অনগ্রসর ও অনুন্নত এলাকার বিনিয়োগকারীদের জন্য আলাদা কর অবকাশ সুবিধা চায় বাংলাদেশ রফতানি প্রক্রিয়াকরণ এলাকা কর্তৃপক্ষ (বেপজা)।

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) প্রাক-বাজেট আলোচনায় গতকাল বেপজার নির্বাহী পরিচালক (বিনিয়োগ উন্নয়ন) তানভীর হোসেন এ প্রস্তাব তুলে ধরেন। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন এনবিআর চেয়ারম্যান মো. আবদুর রহমান খান।

তানভীর হোসেন বলেন, ‘বর্তমানে বান্দরবান, খাগড়াছড়ি ও রাঙ্গামাটি জেলা ব্যতীত ঢাকা ও চট্টগ্রাম বিভাগের অন্যান্য সব জেলায় বিনিয়োগের জন্য পাঁচ বছর এবং বান্দরবান, খাগড়াছড়ি ও রাঙ্গামাটি জেলাসহ অন্যান্য বিভাগের সব জেলায় বিনিয়োগের জন্য সাত বছরের কর অবকাশ সুবিধা দেয়া হচ্ছে। এ প্রেক্ষাপটে দেখা যাচ্ছে, ঢাকা-চট্টগ্রাম ও এর আশপাশে এবং বিদ্যুৎ, পানি ও গ্যাসের সহজলভ্যতাসহ সমুদ্রবন্দর ও বিমানবন্দরের নিকটবর্তী এলাকায় অধিক পরিমাণে শিল্পায়ন হচ্ছে। পক্ষান্তরে এসব সুবিধার অভাব রয়েছে এমন এলাকাগুলোয় আশানুরূপ শিল্পায়ন হচ্ছে না, যা দেশের সুষম উন্নয়নের পথে অন্তরায়।’

দেশের সুষম উন্নয়নের লক্ষ্যে প্রত্যন্ত, অনগ্রসর ও অনুন্নত এলাকাগুলোর বিনিয়োগকারীদের আরো অধিক পরিমাণে কর অবকাশ সুবিধা দেয়া যেতে পারে বলে মন্তব্য করেন তিনি। এর ফলে সাময়িকভাবে দেশের রাজস্বের ওপর কিছুটা নেতিবাচক প্রভাব পড়লেও দেশে বিনিয়োগ বাড়বে, যা প্রকারান্তরে দীর্ঘমেয়াদে রাজস্ব আহরণের পরিমাণ বৃদ্ধি করবে বলেও জানান।

বেপজার নির্বাহী পরিচালক বলেন, ‘বর্তমানে বিনিয়োগ উন্নয়ন সংস্থা ভেদে বিনিয়োগকারীদের প্রদত্ত কর অবকাশ সুবিধার ভিন্নতা পরিলক্ষিত হচ্ছে, যা বিনিয়োগ আকর্ষণের ক্ষেত্রে সমস্যার সৃষ্টি করছে। এর ফলে প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ের নিয়ন্ত্রণাধীন সমমর্যাদা সম্পন্ন দুটি বিনিয়োগ উন্নয়ন সংস্থার বিনিয়োগকারীদের মধ্যে একটি অসম প্রতিযোগিতার সৃষ্টি হয়, যা সুষম বিনিয়োগের অন্তরায়। এ অবস্থায় বেপজা, বেজা, বিডা এবং বাংলাদেশ হাই-টেক পার্ক কর্তৃপক্ষের আওতাধীন সব শিল্পপ্রতিষ্ঠানের জন্য সুষম কর অবকাশ সুবিধা ও প্রণোদনার ব্যবস্থা গ্রহণ করা যেতে পারে।’

তিনি বলেন, ‘‌বিনিয়োগ সুবিধা প্রদানের ক্ষেত্রে সামঞ্জস্যতা আনয়নের পাশাপাশি বিনিয়োগ উৎসাহিত করতে শিল্পপ্রতিষ্ঠান পরিচালনা-সংক্রান্ত প্রয়োজনীয় গাড়ি (যেমন- মালামাল পরিবহনের জন্য ট্রাক, পিকআপ, প্রাইম মুভার ও ট্রেইলার শ্রমিকদের যাতায়াত সুবিধা প্রদানের জন্য বাস অথবা মাইক্রোবাস ইত্যাদির মধ্যে যেকোনো দুটি) শুল্কমুক্তভাবে আমদানির সুযোগ দেয়া যেতে পারে।’

আমেরিকান চেম্বার অব কমার্স ইন বাংলাদেশের (অ্যামচেম) পক্ষে বাজেট প্রস্তাব তুলে ধরেন ফিলিপ মরিস বাংলাদেশের ব্যবস্থাপনা পরিচালক রেজাউর রহমান মাহমুদ। তিনি বলেন, ‘ক্রেডিট কার্ডের ক্ষেত্রে রিটার্ন দাখিলের প্রমাণপত্র (পিএসআর) বাধ্যতামূলক না করে শুধু টিআইএন বাধ্যতামূলক করা হোক। কার্বোনেটেড বেভারেজে সাপ্লিমেন্টারি ডিউটি বা এসডি হ্রাস করা হোক। মেডিকেল ডিভাইস ও টেকনোলজিতে ভ্যাট হার কমানো হোক।’

আমেরিকান চেম্বার ৫ লাখ টাকার নিচে ক্রেডিট কার্ড ইস্যুর জন্য আয়কর রিটার্ন স্লিপ জমা দেয়ার বাধ্যবাধকতা বাতিলের প্রস্তাব দিয়েছে। রফতানির ক্ষেত্রে উৎসে করের হার আগের মতো ১ শতাংশ থেকে কমিয়ে শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ করার প্রস্তাব দিয়েছে সংগঠনটি।

তার এ বক্তব্যের জবাবে এনবিআর চেয়ারম্যান মো. আবদুর রহমান খান বলেন, ‘কার্বোনেটেড বেভারেজ জাতীয় পণ্যে কর বাড়ানোর জন্য বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) চাপ আছে। এসডি কমাবে না এনবিআর। অন্য বিষয়ে বিবেচনা করা যেতে পারে। বড়দের যদি এত সুবিধা দেয়া হয়, তাহলে ছোটরা মারা যাবে।’

এনবিআরের সদস্য (কাস্টমস নীতি ও আইসিটি) হোসেন আহমদ বলেন, ‘এক গ্লাস বেভারেজে চিনি থাকে ১০ চা চামচ। চিনি-জাতীয় পণ্যে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে করহার বেশি থাকে।’

স্থলবন্দরগুলোর সীমানা এক কিলোমিটার করে বৃদ্ধির দাবি জানান ইন্ডিয়া-বাংলাদেশ চেম্বারের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আবদুল ওয়াহেদ। তিনি বলেন, ‘‌আমদানি পর্যায়ে মিথ্যা ঘোষণায় ২০০ শতাংশ জরিমানার বিধান রয়েছে। অনেক সময় অনিচ্ছাকৃত ভুলও হয়, সেক্ষেত্রেও ২০০ শতাংশ জরিমানা করা হয়।’ অনিচ্ছাকৃত ভুলের ক্ষেত্রে জরিমানার বিধান বিবেচনার দাবি জানান তিনি। এছাড়া নারায়ণগঞ্জ বন্দরকে সচল করার দাবিও জানান।

ইন্ডিয়া-বাংলাদেশ চেম্বারের পক্ষে প্রস্তাবে ভারত থেকে আসা পণ্য সরাসরি জাহাজে বা বাল্কে নারায়ণগঞ্জে এনে খালাসের সুযোগ চেয়ে বলা হয়, এতে করে আমদানি খরচ অনেকটাই কমবে। এছাড়া আমদানি পণ্যের মূল্য নির্ধারণের ক্ষেত্রে পণ্যের মান, ব্র্যান্ড, মডেল দেখা ও সমজাতীয় পণ্যের তিন মাসের ঘোষিত মূল্য আমলে নেয়ার প্রস্তাব করেছে সংগঠনটি। এক্ষেত্রে তাদের প্রস্তাব হচ্ছে, পণ্যের পরিমাণ কম-বেশি হলে মূল্য নির্ধারণে তা বিবেচনা করতে হবে। যেমন ১০ টন ও ১০০ টন সমজাতীয় পণ্যের আমদানি মূল্য এক হবে না। শুল্কায়নের সময় পণ্যের মূল্য নির্ধারণে পরিমাণের বিষয়টিকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।

এছাড়া প্রাক-বাজেট আলোচনা হাই-টেক পার্ক কর্তৃপক্ষের ব্যবস্থাপনা পরিচালক একেএম আমিরুল ইসলাম, বেজার পরিচালক ইমতিয়াজ হাসান, অ্যামচেমের সহসভাপতি সৈয়দ মোহাম্মদ কামাল ও বিজনেস ইনিশিয়েটিভ লিডিং ডেভেলপমেন্টের (বিল্ড) সিইও ফেরদৌস আরা বেগম বাজেট প্রস্তাব তুলে ধরেন। আলোচনায় আরো অংশ নেন মেটলাইফ, সিটি ব্যাংক ও কোকা-কোলা বাংলাদেশের প্রতিনিধিরা। এ সময় এনবিআর সদস্য (আয়কর নীতি) একেএম বদিউল আলমসহ বাজেট প্রণয়ন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

আরও